জিএম আব্দুল গফুর, বিশেষ প্রতিনিধি
সাতক্ষীরার শ্যামনগর সদর হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডের একটি বেডে শুয়ে আছেন অস্ত্রোপচারের রোগী রফিকুল ইসলাম। সামনে অ্যালুমিনিয়ামের থালায় পড়ে থাকা খাবার দেখে তাঁর মুখে বিষাদের ছাপ। সাদা ভাতের ওপর ভেসে থাকা পাতলা ঝোলে গুটিকয়েক আলুর টুকরো ছাড়া মাংসের অণুপরিমাণ দেখা মেলাই দুষ্কর। বাজার থেকে ফেলে দেওয়া পচা-গলানো আলু দিয়ে তৈরি এই অস্বাস্থ্যকর তরকারি আর অরুচিকর পরিবেশন কোনো দূরারোগ্য রোগীর মুখে রুচি ফেরানো তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষেরও খাওয়ার জো নেই। অভিযোগ উঠেছে, একটি প্রভাবশালী টেন্ডার সিন্ডিকেটের হাত ধরে শ্যামনগর সদর হাসপাতালে রোগীদের পাতে প্রতিনিয়ত তুলে দেওয়া হচ্ছে চরম নিম্নমানের এই খাবার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ঢিলেঢালা নজরদারি ও উদাসীনতার সুযোগে হাসপাতালের খাবার সরবরাহের কাজ দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ করছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। প্রতিযোগিতাহীন টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বছরের পর বছর কাজ বাগিয়ে নিয়ে এই চক্রটি রোগীদের বরাদ্দের টাকা লোপাট করছে। সঠিক পর্যবেক্ষণ ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা না থাকায় সরকারি এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি এখন কার্যত অভিভাবকহীন অবস্থায় পড়েছে। সিন্ডিকেটের এই একচ্ছত্র আধিপত্যের মাশুল গুনতে হচ্ছে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা শত শত অসহায় রোগীকে।
হাসপাতালের প্রশাসনিক খাতায় যাই লেখা থাকুক না কেন, বাস্তবে প্রতি বেলা রোগীদের থালায় পৌঁছাচ্ছে নামমাত্র খাবার। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়
সকালের নাশতা থেকে শুরু করে দুপুর ও রাতের খাবারে সবজির নামে মূলত সরবরাহ করা হয় নিম্নমানের আলু। ঝোলের পরিমাণ পানির মতো পাতলা, যার মধ্যে মশলা বা তেলের উপস্থিতি নামমাত্র।
সাপ্তাহিক তালিকায় মাছ-মাংস থাকার কথা বলা হলেও পাতে পড়ে হাড়-ছাল কিংবা আঙুল দিয়ে গোনা ছোট টুকরো। অনেক সময় মাংসের ঝোল দেওয়া হলেও মাংসের টুকরোর দেখা মেলে না।
ভাত হিসেবে পরিবেশন করা হচ্ছে চালের নিম্নমানের কণা ও কাঁকরযুক্ত ভাত। ডাল এতটাই পাতলা যে তা ভাতের সঙ্গে মেখে খাওয়ার উপযোগিতা হারিয়ে ফেলে।
হাসপাতালে ভর্তি প্রসূতি নারী ও অস্ত্রোপচারের রোগীদের জন্য পুষ্টিকর খাবার পুনরুদ্ধারের অন্যতম হাতিয়ার। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে খাবারের নিম্নমানের কারণে রোগীদের শারীরিক সুস্থতা পিছিয়ে পড়ছে। ভর্তি থাকা একাধিক রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তীব্র অসন্তোষের কথা।
খাবারের নিম্নমান ও অরুচিকর পরিবেশনের কারণে যেসব রোগীর সামর্থ্য রয়েছে, তাঁরা বাধ্য হয়ে বাইরের হোটেল থেকে বাড়তি খরচে খাবার কিনে আনছেন।
যেসব রোগীর বাইরের হোটেল থেকে কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই, বাধ্য হয়ে তাঁদের এই পুষ্টিহীন ও অস্বাস্থ্যকর খাবারই গিলে খেতে হচ্ছে, যা তাঁদের উল্টো স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, অসুস্থ মানুষের সুস্থতার জন্য সঠিক ও পরিচ্ছন্ন খাবার মোট চিকিৎসার অর্ধেকেরও বেশি কাজ করে। কিন্তু শ্যামনগরে ঠিকাদার ও হাসপাতালের ভেতরের একটি অসাধু চক্রের পকেট ভারী করতে গিয়ে রোগীদের প্লেটে যদি কেবল আলু আর ভাতের জোগান দেওয়া হয়, তবে চিকিৎসাসেবার পুরো উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়।
হাসপাতালের প্রশাসনিক তদারকি শূন্যের কোঠায় পৌঁছানোয় দিন দিন ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয় সচেতন মহলের। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে এই টেন্ডার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ নিয়ে শ্যামনগর সদর হাসপাতালে মানসম্মত খাবার পরিবেশন নিশ্চিত করতে হবে।