সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি
সাতক্ষীরার কলারোয়ায় সরকারি খাস জমির পজেশন অবৈধভাবে হস্তান্তর ও বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দেয়াড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মফের বিরুদ্ধে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই অপকর্ম চালিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সম্প্রতি উপজেলার পশ্চিম খোর্দ এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে এবং স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিযোগকারীদের সঙ্গে কথা বলে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সাল থেকে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা ও সরকারি বিধিবিধান সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান মফে সরকারি খাস জমির পজেশন বিক্রি করে আসছেন। এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও দীর্ঘদিন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযোগ দেওয়ার পর পজেশন বিক্রির কার্যক্রম আরও বাড়িয়ে দেন এই দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যান।
লিখিত অভিযোগকারী পশ্চিম খোর্দ এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা ইবাদুল্লাহ গাজী বলেন, চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই মাহবুবুর রহমান মফের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল, পজেশন হস্তান্তর এবং বিভিন্ন অনিয়মের পাহাড় গড়ে উঠেছে। ইউনিয়নের হাট-বাজারসহ বিভিন্ন সরকারি সম্পত্তির পজেশন অন্যের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
অভিযোগে প্রকাশ, কলারোয়া উপজেলার ১০৩ নম্বর খোর্দ মৌজার ৪৬৭ নম্বর দাগে মোট ৬২ শতক জমি রয়েছে। এর মধ্যে ‘ক’ তপশিলভুক্ত ৫ শতক এবং ‘খ’ তপশিলভুক্ত ৫৪ শতক জমি রয়েছে। ওই দাগে ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব সম্পত্তি মাত্র ৩ শতক হলেও চেয়ারম্যানের উদ্যোগে সেখানে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫টি পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ঘরের পজেশন বাবদ ৭ থেকে ১০ লাখ টাকা করে নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানেও সেখানে কয়েকটি স্থাপনার নির্মাণকাজ চলছে।
স্থানীয় বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, দোকান বা পজেশন বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে খোর্দো গ্রামের ইমরান হোসেন, পাটুলিয়া গ্রামের গোলাম কিবরিয়া, উলুডাঙ্গা গ্রামের নজরুল গাজী, ওজিয়ার মোল্লা ও সোহগসহ অনেকের কাছ থেকে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। অথচ টাকা নেওয়ার পরও অনেককে কোনো দোকান বা পজেশন বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। সংগৃহীত এসব অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করেছেন অভিযুক্ত চেয়ারম্যান। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় উপজেলা প্রশাসনের কাছে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি বলে জানান বীর মুক্তিযোদ্ধা ইবাদুল্লাহ গাজী।
এদিকে সরকারি সম্পদ বিক্রি, অর্থ আত্মসাৎ এবং আইন অমান্য করে খাস জমি অতিরিক্ত মূল্যে বরাদ্দ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে সম্প্রতি খোর্দ গ্রামের শওকত সরদারের ছেলে আলমগীর হোসেন কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগের পর ইউএনও মো. আরিফুল ইসলামের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরেজমিনে তদন্ত করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা আরবি কর্মকর্তা সোহেল রানা।
তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে কর্মকর্তা সোহেল রানা বলেন, আলমগীর হোসেনের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তদন্তকাজ চলমান রয়েছে এবং খুব দ্রুত পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হবে।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব গুরুতর দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি অভিযুক্ত দেয়াড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান মফে।
সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং এই দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীরা।