বদরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুরের বদরগঞ্জের চাঁদকুঠি গ্রামে এক নারীর বসতবাড়িতে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে এক যুবক ও ওই নারীকে অমানবিক নির্যাতনের পর একই দড়িতে বেঁধে রাখার এক চাঞ্চল্যকর ও ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই মধ্যযুগীয় নির্যাতনের দৃশ্য ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এর অন্তরালে রয়েছে এক সুগভীর চক্রান্ত। নির্যাতন ও বসতবাড়িতে লুটপাটের কোনো ফুটেজ বাইরে আসতে না দিলেও, দুই আসামিকে দড়িতে বাঁধার দৃশ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে রহস্যজনক পুলিশি পদক্ষেপে পুরো বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পৌর শহরের চাঁদকুঠি গ্রামে প্রায় এক সপ্তাহ আগে এক নারীর বাড়িতে এক যুবককে অনৈতিক অবস্থায় পেয়ে স্থানীয় কিছু যুবক ও গ্রামবাসী আটক করে। অভিযোগ উঠেছে, তথাকথিত ‘প্রতিবাদী’ জনতার ব্যানারে উপস্থিত কিছু যুবক প্রথমে ঘরে ঢুকে ওই যুবককে চড়-থাপ্পড় ও নারীকে মেঝেকে ফেলে বেধড়ক নির্যাতন করে। এরপর নারীর ঘরে থাকা নগদ টাকা ও মূল্যবান আসবাবপত্র লুটপাট করা হয়। পরবর্তীতে তাদের দুজনকে একটি মাত্র দড়িতে বেঁধে এলাকায় সার্কাসের মতো প্রদর্শনী চালানো হয় এবং অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।
ঘটনার বিশ্লেষণ করে তথ্য মিলেছে যে, একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে এই নির্যাতন ও লুটপাটের ঘটনা ঘটিয়েছে। মারধর ও লুটপাটের দৃশ্যগুলো আড়াল করতে সুকৌশলে সেগুলোর ভিডিও ধারণ করা হয়নি। কেবল দড়িতে বেঁধে রাখার দৃশ্যটি পরিকল্পিতভাবে ভাইরাল করা হয়েছে, যাতে পুরো ঘটনার একটি নির্দিষ্ট রূপ দেওয়া যায়। সচেতন মহল মনে করছে, নিজেদের অপরাধ ঢাকতেই অভিযুক্ত চক্রান্তকারীরা ভিডিও প্রচারের বিষয়ে এ ধরনের চাতুর্যের আশ্রয় নিয়েছে।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উত্তেজিত জনতার হাত থেকে ওই নারী ও যুবককে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। তবে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে পরদিন পুলিশের পদক্ষেপে। স্থানীয় প্রথানুসারে বা অভিযোগের ধরন অনুযায়ী যদি ঘটনাটি অনৈতিক সম্পর্কের হয়ে থাকে, তবে আইনি প্রক্রিয়া উভয় পক্ষের জন্যই সমান হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু পুলিশ অলৌকিক কোনো কারণে উদ্ধারকৃত নারীকে মামলাটির ‘বাদী’ সাজিয়ে এবং আটক যুবককে ‘বিবাদী’ হিসেবে আদালতে সোপর্দ করে।
প্রশ্ন উঠেছে, যে নারী স্বহস্তে বা নিজ বাড়িতে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেন এবং যেখানে তাকে উদ্ধার করে আনা হলো, তাকে রাতারাতি কোন যুক্তিতে মামলার বাদী বানানো হলো? এর পেছনে কি প্রভাবশালীদের কোনো কলকাঠি নাড়ার সুযোগ রয়েছে?
অন্যদিকে, ওই নারীর বাড়িতে যে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হলো, জনসম্মুখে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে দুইজনকে দড়ি বেঁধে নির্যাতন চালানো হলো এবং ঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হলো—সে বিষয়ে পুলিশের ভূমিকা সম্পূর্ণ নিশ্চুপ।
ঘটনার পর ওই যুবকের পিতা ও তার পরিবার সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র দাবি করে সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। যুবকের বাবার বক্তব্য, “ঘটনার পেছনে যারা চক্রান্ত করেছে, তারাই লুটপাট চালিয়েছে এবং পুলিশকে বিভ্রান্ত করে এককভাবে আমার ছেলেকে অপরাধী বানিয়েছে। ঘটনার মূল সত্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে আমরা উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
যেকোনো মানুষ অপরাধ করলেও তাকে আইন অনুযায়ী বিচার করার এখতিয়ার আদালতের, বিচারবহির্ভূতভাবে দড়ি বেঁধে নির্যাতন করার অধিকার কারও নেই। দেশে আইন থাকা সত্ত্বেও এভাবে একদল যুবকের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, নির্যাতন চালানো ও লুটপাট করার পর পুলিশি ব্যবস্থা না নেওয়া অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
এলাকাবাসীর জোর দাবি, অনতিবিলম্বে ঘটনার সঠিক তদন্ত করে বিচারবহির্ভূত নির্যাতনকারী ও লুটপাটকারী চক্রান্তকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং পুলিশের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন