বিশেষ প্রতিনিধি
সাতক্ষীরা জেলার প্রান্তিক উপজেলা শ্যামনগরে কর্মরত দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, ভুক্তভোগী ও বাদীদের হয়রানি এবং সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের নাশকতার মামলায় ফাঁসানোর হুমকির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা হলেন শ্যামনগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অনিরুদ্ধ রায় (বিপি-৮৬০৫১০৯৫৬৬) এবং সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মোল্লা বদরুজ্জামান (বিপি-৮৫০৫১০ ৩৮৮৯)। একই ব্যাচমেট হওয়ার সুবাদে তারা দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে শ্যামনগর থানা এলাকাকে বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত করেছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি গাবুরা ইউনিয়নের পাসেমাড়ী গ্রামের আব্দুল সামাদ গাজীর ছেলে ইব্রাহিম খলিলকে তার নিজ বাড়ি থেকে আটক করে পুলিশ। আটকের পর সোর্স নাজমুল হাসান নয়নের মাধ্যমে ওই আসামির কাছ থেকে মামলার বাদী সম্পর্কে তথ্য নেওয়া হয়। পরবর্তীতে মামলার প্রকৃত বাদী উপজেলা খানপুরের ভাটার সর্দার ফয়েজ উল্লাহকে থানায় না ডেকে তার শ্যালক ইব্রাহিম গাজীকে থানায় পাঠানো হয়। সেখানে এসআই অনিরুদ্ধ রায় সোর্স নয়নের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন। একপর্যায়ে ৩ হাজার টাকা নেওয়া হলেও পরবর্তীতে আরও ১ হাজার টাকার জন্য চাপ সৃষ্টি করে ইব্রাহিমকে বারবার হুমকি দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী ইব্রাহিম বিষয়টি সাংবাদিকদের কাছে সরাসরি স্বীকার করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এর আগেও একই উপায়ে অপকর্ম ঢাকা ও অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটিয়েছেন এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা। গত ৫ সেপ্টেম্বর বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে গাবুরা দ্বীপ ইউনিয়নের চাঁদনীমুখা এলাকায় অভিযান চালিয়ে জিআর-৬৩/১৬ (শ্যাম:) এবং টিআর-৩৮০/২২ নম্বর মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি মুসাক গাজীর ছেলে শাহজাহানকে গ্রেপ্তার করেন তারা। তবে গোপনে ৫ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে ঘটনাস্থল থেকেই আসামিকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
বিষয়টি নিয়ে ‘গ্রীন টিভি’র সাংবাদিক ইয়াছিন আরাফাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি লাইভ সম্প্রচার করলে তোলপাড় শুরু হয়। অপকর্ম ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে মধ্যরাতে তড়িঘড়ি করে পুনরায় গাবুরা দ্বীপে অভিযান চালিয়ে ওই আসামি শাহজাহানকে ধরে এনে পরদিন আদালতে প্রেরণ করে পুলিশ। একই সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে সাংবাদিকদের হাত-পা ধরে বিষয়টি চেপে যাওয়ার মিনতি জানান অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা।
তবে সাম্প্রতিক এসব ঘটনা নিয়ে আবারও সাংবাদিকরা যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে এসআই অনিরুদ্ধ রায় ও এএসআই বদরুজ্জামান ফোন রিসিভ করা বন্ধ করে দেন। উল্টো শ্যামনগরে সংবাদকর্মীদের দেখে নেওয়া, নাশকতার মামলাসহ নানা মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা জানান।
স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, থানা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরবর্তী সুন্দরবনসংলগ্ন দুর্গম গাবুরা দ্বীপের অসচ্ছল ও খেটে খাওয়া মানুষকে মূল লক্ষ্য বানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ওয়ারেন্ট ও গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করছে এই পুলিশ সিন্ডিকেট। ইতিপূর্বে একই সিন্ডিকেটের সদস্য তাদের ব্যাচমেট কনস্টেবল মাহবুবের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মেলায় তাকে বদলি করা হয়েছিল, তবে এসআই অনিরুদ্ধ ও এএসআই বদরুজ্জামান স্বপদে বহাল থেকে স্বৈরাচারী শাসনের আমলের প্রভাব খাটিয়ে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।
সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার মহোদয় যেখানে ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর নীতি অবলম্বন করছেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য অপরাধে জড়িয়ে পড়লে কঠোর আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, সেখানে এই কর্মকর্তাদের তোয়াক্কাহীন কর্মকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তি চরম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
ভুক্তভোগী ও সুশীল সমাজ অনতিবিলম্বে অভিযুক্ত এসআই অনিরুদ্ধ রায় এবং এএসআই মোল্লা বদরুজ্জামানকে শ্যামনগর থানা থেকে ক্লোজ (প্রত্যাহার) করে বিভাগীয় তদন্ত এবং কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় বিষয়টি নিয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হবে বলে জানান স্থানীয় সাংবাদিক ও ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
মন্তব্য করুন