নিজস্ব প্রতিবেদক
রোগীর পছন্দের ল্যাব বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করানোর ‘অপরাধে’ ফি নেওয়ার পরও ব্যবস্থাপত্র ও চিকিৎসাসেবা না দিয়ে হাসপাতাল থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার এক নজিরবিহীন অভিযোগ উঠেছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ‘তট প্যাথলজি’ ও সেখানে কর্মরত চিকিৎসক ডা. কানিজ ফাতেমার বিরুদ্ধে রোগীদের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সেবা গ্রহণে বাধ্য করা এবং তথাকথিত ‘টেস্ট বাণিজ্য’ সিন্ডিকেটের প্রতিবাদে সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এক ভুক্তভোগী তাঁর অসুস্থ স্ত্রীকে জরুরি চিকিৎসার জন্য শ্যামনগরের তট প্যাথলজিতে নিয়োজিত ডা. কানিজ ফাতেমার শরণাপন্ন হন। নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসকের নির্ধারিত ৪০০ টাকা ভিজিট পরিশোধ করার পর তিনি রোগীর শারীরিক অবস্থা দেখে কিছু রক্ত পরীক্ষা ও একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম করার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী রোগী সরকারি হাসপাতাল কিংবা অন্য কোনো স্বনামধন্য ও সরকার স্বীকৃত ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে রক্ত পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত নেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, অন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারের উদ্দেশ্যে রওনা হতেই তট প্যাথলজির রিসেপশন থেকে ফোন করে হুমকি স্বরূপ বার্তা পাঠানো হয় যে, অন্য কোথাও থেকে পরীক্ষা করালে চিকিৎসক আর রোগী দেখবেন না। এরপর ভুক্তভোগী সরাসরি চিকিৎসকের মুখোমুখি হয়ে অন্য স্বীকৃত ক্লিনিকের রিপোর্টের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে, চিকিৎসক ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের দোহাই দিয়ে সেবা প্রদানে সাফ অস্বীকৃতি জানান।
পরবর্তীতে নাটকিয়ীয়ভাবে চিকিৎসকের এক সহকারী এসে জানান যে, রক্ত পরীক্ষা বাইরে করালেও আল্ট্রাসনোগ্রাম বাধ্যতামূলকভাবে তাদের প্রতিষ্ঠানেই করতে হবে। ভুক্তভোগী এতে সম্মতি জানিয়ে আল্ট্রাসনোগ্রামের জন্য ৬০০ টাকা রিসেপশনে জমা দিলেও, রিসেপশনিস্ট অচিন্ত্য বৈদ্য চিকিৎসকের কক্ষ থেকে ঘুরে এসে জানিয়ে দেন—তট প্যাথলজি থেকে সব পরীক্ষা না করালে কোনোভাবেই রোগী দেখা হবে না। একপর্যায়ে ডাক্তার দেখানোর ভিজিট ও আল্ট্রাসনোগ্রাম ফি বাবদ জমাকৃত মোট ১,০০০ টাকা ফেরত দিয়ে চরম দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে অসুস্থ রোগীকে প্রতিষ্ঠান থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, একজন অসুস্থ রোগী কোথা থেকে ও কোন ল্যাবে পরীক্ষা করাবেন তা তাঁর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও মৌলিক অধিকার। কোনো নির্দিষ্ট প্যাথলজিতে পরীক্ষা করাতে বাধ্য করা এবং কথামতো না চললে জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা চরম বেআইনি, অমানবিক এবং চিকিৎসা নীতিশাস্ত্রের (Medical Ethics) ঘোর পরিপন্থী। এর নেপথ্যে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও নির্দিষ্ট কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনৈতিক কমিশন বা ‘টেস্ট বাণিজ্য’ জড়িত থাকার প্রবল আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্থানীয় সচেতন মহল।
অসুস্থ রোগীকে হয়রানি, অপমান ও সেবাবঞ্চিত করার এ ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সিভিল সার্জনের কাছে দায়ের করা আবেদনে কেবল এই ঘটনার একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তই চাওয়া হয়নি, বরং শ্যামনগর উপজেলার আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা ক্লিনিক সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্য চিরতরে বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার দাবি জানানো হয়েছে। সাধারণ রোগীদের মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে অভিযুক্ত চিকিৎসক, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রত্যাশা করছেন ভুক্তভোগী পরিবারসহ এলাকার সর্বস্তরের মানুষ।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ক্লিনিক ম্যানেজার অচিন্ত্য বৈদ্যের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনাটিকে এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “বিষয়টা তো সামান্য ব্যাপার। এ বিষয়ে পত্র-পত্রিকায় না লিখে আসুন আমাদের ক্লিনিকে।” বলেই তিনি তড়িঘড়ি করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
তট প্যাথলজি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক দেবনাথ বৈদ্য দাবি করেন, “আমাদের সব বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। তাছাড়া কোনো একটি মহল আমাদের ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন করতে এবং ফাঁসানোর জন্য গভীর ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।”
পুরো বিষয়টি নিয়ে সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম বলেন, “কোনো রোগীকে নির্দিষ্ট কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করাতে বাধ্য করা বা পরীক্ষার স্থান পছন্দের কারণে চিকিৎসাসেবা না দেওয়া অত্যন্ত গর্হিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, ক্লিনিক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোগীর অধিকার ও চিকিৎসাসেবার মান নিশ্চিত করতে আমরা বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে দেখছি।”
মন্তব্য করুন