আবু রায়হান, মণিরামপুর
প্রেমের সম্পর্কের পর দুই পরিবারের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে দুই বছর আগে বিয়ে করেছিলেন রচনা দাস (২২) ও সুজিত দাস। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে রচনার পরিবার বিয়েটি মেনে নিলেও কয়েক মাস পর পারিপার্শ্বিক চাপে ছেলে ও পুত্রবধূকে বাড়িতে তুলে নেন সুজিতের বাবা সুরঞ্জন দাস। তবে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার পর থেকেই রচনার জীবনে নেমে আসে নির্যাতনের অভিযোগ।
এক সন্তানের জননী রচনা দাস যশোরের মণিরামপুর পৌরসভার মহাদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং হোগলাডাঙ্গা এলাকার এক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বাবার মেয়ে। তার অভিযোগ, শ্বশুরবাড়িতে কোনো ঘটনা ঘটলেই তাকে দোষারোপ করা হতো। শ্বশুর-শাশুড়ির পাশাপাশি ভাসুর বাড়িতে থাকলে তিনিও তাকে মারধর করতেন। প্রথমদিকে স্বামী সুজিত দাস প্রতিবাদ করলেও পরবর্তীতে তিনিও পরিবারের অন্যদের সঙ্গে যোগ দিয়ে তাকে মারধর করতেন বলে অভিযোগ রচনার।
রচনার অভিযোগ, তাকে প্রায়ই ‘গরিবের মেয়ে’ বলে কটূক্তি করা হতো এবং বাবার বাড়ি থেকে দামি জিনিসপত্র এনে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হতো।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে রচনার ভাসুর শুভ দাসের বিরুদ্ধে। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য বলে দাবি করে রচনা অভিযোগ করেছেন, সামরিক পরিচয়ের প্রভাব দেখিয়ে তাকে বিভিন্ন সময় হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও শুভ দাস তাকে উচ্চস্বরে হত্যার হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
এ ঘটনায় আইনের সহায়তা ও ন্যায়বিচার চেয়ে গত বুধবার (২৬ আগস্ট) মণিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রচনা দাস।
লিখিত অভিযোগে রচনা উল্লেখ করেন, দুই পরিবারের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করার পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে নির্যাতন করে আসছেন। স্থানীয়রা কয়েক দফা সালিশ করে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করলেও কিছুদিন পর আবারও তাকে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ তার।
রচনার অভিযোগ, গত ২৫ আগস্ট দিনের বেলায় তার ধারণা হয়, তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ কারণে নিরাপত্তার জন্য তিনি আগে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার ভিডিও স্মার্টফোনে ধারণ করেন। বিষয়টি জানতে পেরে তার শ্বশুর সুরঞ্জন দাস, শাশুড়ি, স্বামী সুজিত দাস ও ভাসুর শুভ দাস একত্রিত হয়ে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, একপর্যায়ে তাকে টানাহেঁচড়া করে পরনের পোশাক ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং তার স্মার্টফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তার গোঙানির শব্দে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন বলে দাবি রচনার। এ সময় তার এক বছর বয়সী সন্তানকেও মারতে তারা উদ্যত হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরবর্তীতে অসুস্থ অবস্থায় ভ্যানে করে যাওয়ার সময়ও তাকে মারধর করা হয়েছে বলে দাবি করেন রচনা। স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীও এমন ঘটনার কথা জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদককে জানান।
রচনার মামা শুদেব দাস বলেন, “রচনার বাবা থেকেও নেই। তিনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। আমিই তার খোঁজখবর রাখি। আমরা গরিব বলে শুভ দাস আগেও আমাকে হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রচনাকে মেরে ফেললেও কেউ কিছু করতে পারবে না। এমনকি রচনাকে মারতে তার রাইফেলের একটি বুলেটই যথেষ্ট বলেও হুমকি দিয়েছেন। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”
তবে রচনার করা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শুভ দাস। মুঠোফোনে সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, “একজন বলল, আপনি সেটা বিশ্বাস করলেন! কী প্রমাণ আছে যে আমি এসব করেছি? আপনার চ্যানেল কী, আপনার নাম বলেন। আমি একজন সেনাবাহিনীর সদস্য। আমাদেরও মিডিয়া আছে। আপনি কোন ধরনের মিডিয়া—খোঁজ নেব।”
এ কথা বলার পর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এদিকে ঘটনার পর থেকে রচনার স্বামী সুজিত দাস আত্মগোপনে রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন রচনার পরিবারের সদস্যরা। তবে সাংবাদিকদের উপস্থিতির বিষয়টি জানতে পেরে পুনরায় সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার জন্য ভুক্তভোগী পরিবারকে বিভিন্নভাবে চাপ ও তদবির করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মণিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবু সাঈদ অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখে পরবর্তীতে আপনাদের জানাব।”
মন্তব্য করুন