নিজস্ব প্রতিনিধি
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রশাসনের নাকের ডগায় বছরের পর বছর ধরে অবাধে চলছে অনুমোদনহীন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই গড়ে ওঠা এসব ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানে অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে চলছে প্রতারণা। ফলে একদিকে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন রোগীরা।
সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২৫৮টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। তবে বাস্তবে এর সিংহভাগেরই স্বাস্থ্য বিভাগের বৈধ লাইসেন্স বা পরিবেশের ছাড়পত্র নেই। হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পুরোনো লাইসেন্স থাকলেও বছরের পর বছর তা নবায়ন না করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নিজস্ব চিকিৎসক ও ডিপ্লোমাধারী নার্স থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও শ্যামনগরের কোনো প্রতিষ্ঠানেই তা মানা হচ্ছে না। এসব প্রতিষ্ঠান মূলত সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা পরিচালনা করছে। একই অবস্থা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোরও, যেখানে ডিপ্লোমাধারী প্যাথলজিস্ট, দক্ষ টেকনিশিয়ান বা আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এছাড়া সরকারি হাসপাতাল থেকে দালাল চক্রের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে এনে মোটা অঙ্কের কমিশন বাণিজ্যে লিপ্ত রয়েছে এই চক্র।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শ্যামনগর উপজেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়কে অবস্থিত ‘তট প্যাথলজি ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এর বৈধ কোনো কাগজপত্র নেই। ২০২৩-২৪ অর্থবছর লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলেও তা নবায়ন করা হয়নি। শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে দালাল দিয়ে রোগী এনে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। লাইসেন্স ও ছাড়পত্র ছাড়াই প্রতিষ্ঠান চালানোর কথা স্বীকার করে পরিচালক দেবনাথ বৈদ্য ও ম্যানেজার অচিন্ত্য বৈদ্য জানান, তারা কেবল লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন এবং সেই আবেদনের কপি দিয়েই কার্যক্রম চালাচ্ছেন, যা তারা নিজেদের ভুল হিসেবেও দাবি করেন।
এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. জিয়াউর রহমান জানান, আবেদনে থাকা অবস্থাতেই প্রতিষ্ঠানটি চালানো সম্ভব এবং তারা লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য।
তবে বিপরীত মন্তব্য করেছেন সাতক্ষীরা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সৌমেন মৈত্র। তিনি স্পষ্ট জানান, ছাড়পত্র ছাড়া কোনো অবস্থাতেই এসব প্রতিষ্ঠান চালানোর সুযোগ নেই। জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত নজরদারি করা সম্ভব না হলেও শিগগিরই এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. আব্দুস সালাম বলেন, জেলার সব প্রতিষ্ঠানের তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। যাদের লাইসেন্স বা নবায়ন নেই, তাদের দ্রুত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; অন্যথায় কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অনুমোদনহীন এসব চিকিৎসাকেন্দ্র সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেললেও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কনকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ভুয়া টেকনিশিয়ান ও কাগজপত্রহীন প্যাথলজির এই রমরমা বাণিজ্য অবিলম্বে বন্ধ করে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল।
মন্তব্য করুন