বিশেষ প্রতিনিধি,
সিডর, আইলা, আমফানসহ একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষত এখনও শুকায়নি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় জনপদে। অথচ সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে এখন যুক্ত হয়েছে মানবসৃষ্ট চরম বিপর্যয়। শ্যামনগরের বিভিন্ন নদীর তীরঘেঁষে আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে দিন-রাত অবাধে চলছে অবৈধ বালু ও মাটি কাটার মহোৎসব। একের পর এক নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে, যার প্রভাবে হাজার হাজার বিঘা কৃষিজমি ও বসতভিটা হারিয়ে সাধারণ মানুষ এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন।
সরেজমিনে ও অনুসন্ধানে জানা যায়, শ্যামনগরের কেবল নির্দিষ্ট কোনো পয়েন্টে নয়, বরং খোলপেটুয়া নদীসহ গাবুরা, পদ্মপুকুর, কাশিমাড়ী ও কৈখালী ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী সংবেদনশীল পয়েন্টগুলো থেকে ড্রেজার লাগিয়ে অনবরত বালু তোলা হচ্ছে। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী অসাধু বালিমহল চক্র নদীগুলোর তলদেশ ফাঁপা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী উপকূলীয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মূল প্রতিরক্ষা বাঁধ বা পাড়ের কাছাকাছি থেকে বালু তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও, এই সিন্ডিকেট একদম বাঁধের গোড়া থেকে বালু উত্তোলন করে চলেছে।
ইতিপূর্বে নদীভাঙনে হাজার হাজার বিঘা আবাদি জমি ও চিংড়ি ঘের হারিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এখন নতুন করে এই অবৈধ বালু খেকোর দল সক্রিয় হওয়ায় আবারও নদীগর্ভে বিলীন হতে বসেছে শত শত ঘরবাড়ি। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানোর ঝুঁকিতে থাকা ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “আমরা উপকূলের মানুষ এমনিতেই ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ভয়ে তটস্থ থাকি। তার ওপর দিন-রাত ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার কারণে আমাদের চোখের সামনে পাড় ধসে পড়ছে। নদীর বাঁধ ভাঙলে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হবে, কিন্তু এই অসাধু ব্যবসায়ীদের থামানোর কেউ নেই।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, শ্যামনগরে অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে কিংবা তোলপাড় সৃষ্টি হলে উপজেলা প্রশাসন বা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) সাময়িক তৎপরতা দেখা যায়। দু-একটি অভিযান চালিয়ে লোকদেখনো জরিমানা করা হলেও, কিছুদিন পরই অলৌকিকভাবে আবারও একই কায়দায় একই স্থানে বালু কাটা শুরু হয়। স্থায়ী সমাধান বা এই সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় না আনায় এই অবৈধ ব্যবসা কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শ্যামনগরের দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় টেকসই ভেড়িবাঁধ না থাকায় নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে এভাবে বালি তোলা আত্মঘাতী পদক্ষেপ। এতে উপকূল রক্ষা বাঁধ ভেঙে যেকোনো মুহূর্তে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে কৃষি, চিংড়ি সম্পদ ও সামগ্রিক পরিবেশে স্থায়ী বিপর্যয় ডেকে আনবে।
সাময়িক লোকদেখানো অভিযান নয়, বরং অবৈধ বালি মহালের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে মোটা অঙ্কের জরিমানা ও দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড প্রদানের দাবি জানিয়েছেন উপকূলবাসী। একই সাথে গাবুরা, পদ্মপুকুর, কাশিমাড়ী ও কৈখালীর মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নদী ও মানুষকে রক্ষা করতে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সরাসরি হস্তক্ষেপে একটি স্থায়ী প্রশাসনিক নজরদারি টিম গঠনের আকুল আকুতি জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।
মন্তব্য করুন