নিজস্ব প্রতিবেদক,
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর কৃষ্ণনগর ও ২ নম্বর বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের সহকারী কর্মকর্তা (ভূমি নায়েব) ফয়েজ আহমেদ এবং পিয়ন আহম্মদ আলীর বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, খাসজমি দখল, দুর্নীতি ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে একই সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নের দায়িত্ব পালনকালে তারা গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে চরমভাবে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নামজারি (খারিজ), ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, সীমানা নির্ধারণ ও তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির মতো অতিপ্রয়োজনীয় প্রতিটি সরকারি সেবার জন্য নিয়মিত অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। নির্দিষ্ট ফি ছাড়াও প্রতিটি স্তরে ঘুষের অঙ্ক নির্ধারিত রয়েছে এবং সেই দাবীকৃত টাকা না দিলে মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা হয়।
২ নম্বর বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. করিম সরদার অভিযোগ করেন, জমির মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে একরপ্রতি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। এমনকি বিষ্ণুপুরের এক বাসিন্দার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে প্রকৃত পক্ষে তার বিপক্ষেই প্রতিবেদন দেওয়ার ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে ১ নম্বর কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম জানান, নামজারির আবেদনের পর তাঁর ফাইল আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে ওই অফিসের পিয়ন আহম্মদ আলী ও নায়েব ফয়েজের দালালচক্রের মাধ্যমে ৮ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়ার পরেই কেবল তাঁর কাজ সম্পন্ন হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নায়েব ফয়েজের সব ঘুষের টাকা সরাসরি সংগ্রহ করেন পিয়ন আহম্মদ আলী। সম্প্রতি বর্তমান সাতক্ষীরা পত্রিকার একটি প্রতিনিধি দল ভূমি অফিসে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে ভিন্ন চিত্র দেখতে পায়। অফিসের সীমানাপ্রাচীরের কোণে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে পিয়ন আহম্মদ আলী সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের কাছ থেকে সরাসরি ঘুষের টাকা আদায় করছেন। সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি ভূমি অফিসের পেছন দিয়ে পালিয়ে যান। একইভাবে কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা গফুর সরদার জানান, মাত্র ১০০ টাকা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের জন্য পিয়ন আহম্মদ আলী সার্ভারের সমস্যার অজুহাত দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা আদায় করেছেন।
স্থানীয়দের মতে, পিয়ন আহম্মদ আলী ও দালালদের মাধ্যম ছাড়া সাধারণ সেবাগ্রহীতারা কোনো কাজই করাতে পারেন না। আহম্মদ আলী এর আগে বসন্তপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত থাকাকালীনও একই ধরনের ঘুষ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই ভূমি অফিসের চিত্র বদলে যায়। নায়েব ফয়েজের নেতৃত্বে সেখানে বসে সারাদিনের আদায় করা ঘুষের টাকা ভাগবাটোয়ারার আসর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষ্ণনগরের এক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জীবনে এত বড় ঘুষখোর নায়েব তিনি দেখেননি। ঘুষের টাকায় তিনি আলিশান বাড়ি ও গাড়ি করেছেন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের এক দরিদ্র পরিবারের নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ রয়েছে, যা পরবর্তীতে অর্থ দিয়ে ধামাচাপা দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নায়েব ফয়েজ কালিগঞ্জ উপজেলার পানিয়া মৌতলা এলাকার একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা ছিলেন একজন দিনমজুর, যাঁদের প্রতিনিয়ত কাজ না করলে ঠিকমতো খাবার জুটত না। কিন্তু ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর রাতারাতি কোটিপতি বনে যান ফয়েজ আহমেদ।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কালিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদীর সঙ্গে যোগসাজশে অবৈধভাবে ৫০ একরের বেশি খাসজমি ইজারা দেখান তিনি। পরবর্তীতে ভুয়া কাগজ বানিয়ে সাঈদ মেহেদী ও ফয়েজ যৌথভাবে সেখানে মাছ চাষের প্রকল্প গড়ে তোলেন। এমনকি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিও জোরপূর্বক খাস দেখিয়ে দখলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তৎকালীন রাজনৈতিক নেতার নাম ভাঙিয়ে দাপটের সঙ্গে ফয়েজ কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন।
মৌতলা এলাকায় অবৈধ উপার্জনে তিনি প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে একটি দোতলা আলিশান বাড়ি নির্মাণ করেছেন। সরকারি চাকরির আয়কর নথি ও সম্পদ বিবরণীর সঙ্গে তাঁর বর্তমান জীবনযাত্রার মানের স্পষ্ট গরমিল রয়েছে। নিজ ও বেনামে প্রায় ২০ বিঘা জমিও ক্রয় করেছেন তিনি।
আইনগত ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ
সাতক্ষীরার আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি পদে আসীন থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ঘুষের মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭ ধারায় একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সরকারি বেতনের বাইরে তাঁর এই বিপুল সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অবিলম্বে তাঁর সম্পদ বিবরণী তলব করতে পারে এবং অপরাধজনক অসদাচরণের (Criminal Misconduct) দায়ে মামলা রুজু করতে পারে।
এ ছাড়া সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে স্পষ্ট চাকরিবিধি ভঙ্গের প্রমাণ রয়েছে। ঘুষ গ্রহণ, ফাইল আটকে রাখা, দালালচক্র লালন ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়ে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত (Suspension) করে বিভাগীয় তদন্ত শুরু করতে পারেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর স্থানীয় নেতা আবুল হোসেন বলেন, “এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তাঁর অর্জিত সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”
অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাওয়া হলে নায়েব ফয়েজ আহমেদ তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। অন্যদিকে, পিয়ন আহম্মদ আলীর বক্তব্য নিতে গেলে সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি ভূমি অফিসের পিছন দিয়ে পালিয়ে যান।
মন্তব্য করুন